স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র বাদ যাচ্ছে না: জুলাই সনদে যা যা আছে

🇧🇩 

জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫: সংক্ষিপ্ত প্রেক্ষাপট

দেশে দীর্ঘ আট মাস ধরে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার পর অবশেষে আজ স্বাক্ষরিত হলো বহুল আলোচিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ–২০২৫’। এই সনদে বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামো, শাসনব্যবস্থা, নির্বাচন ও সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে বড় ধরনের প্রস্তাব আনা হয়েছে।

তবে সনদের মূল বিতর্কের বিষয় ছিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র সংবিধান থেকে বাদ দেওয়া হবে কি না—এ নিয়েই রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র উত্তেজনা দেখা দেয়।

⚖️ 

বিতর্কিত অংশ: স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র থাকবে তো বাদ যাবে?

প্রথম খসড়ায় বলা হয়েছিল, সংবিধানের ১৫০(২) অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত করা হবে এবং এর সঙ্গে যুক্ত পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম তফসিল রাখা হবে না।

এই তিনটি তফসিলের গুরুত্ব অপরিসীম—

  • পঞ্চম তফসিল: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চ ১৯৭১-এর ঐতিহাসিক ভাষণ
  • ষষ্ঠ তফসিল: বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা (২৫ মার্চ মধ্যরাতের পর)
  • সপ্তম তফসিল: ১০ এপ্রিল ১৯৭১ তারিখে মুজিবনগর সরকারের জারি করা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র

এই তিনটি দলিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও মুক্তিযুদ্ধের বৈধতার মূল দলিল। তাই এগুলো বাদ দেওয়ার প্রস্তাব আসতেই ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে।

🚩 

বাম দলগুলোর আপত্তি ও বর্জন ঘোষণা

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাসদ, বাসদ (মার্ক্সবাদী) ও বাংলাদেশ জাসদ এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দেয়—

“স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র বাদ দেওয়া মানে বাংলাদেশের অস্তিত্বের ভিত্তি ধ্বংস করা।”

তারা সাফ জানিয়ে দেয়, এই অবস্থায় তারা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করবে না।

ফলে আজকের স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ওই চারটি দল অংশ নেয়নি।

🏛️ 

শেষ মুহূর্তে পরিবর্তন: বাদ যাচ্ছে না স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র

বিরোধ ও আপত্তির মুখে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন বৃহস্পতিবার রাতেই সনদের কিছু ধারা পরিবর্তন করে।

চূড়ান্ত সনদে এখন বলা হয়েছে—

“সংবিধানের ১৫০(২) অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হবে; তবে সংশ্লিষ্ট পঞ্চম ও ষষ্ঠ তফসিল সংবিধানে রাখা হবে, অর্থাৎ স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা বাদ যাচ্ছে না।”

অর্থাৎ সপ্তম তফসিলের কিছু অংশ বাদ দেওয়া হতে পারে, তবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অক্ষুণ্ণ থাকবে।

✍️ 

স্বাক্ষর অনুষ্ঠান ও উপস্থিতি

আজ বিকেল ৪টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেন। তাঁর সঙ্গে স্বাক্ষর করেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্যরা এবং ২৪টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা।

অনুষ্ঠান শুরু হয় জাতীয় সংগীত পরিবেশনার মাধ্যমে।

স্বাক্ষর শেষে মুহাম্মদ ইউনূস বলেন—

“এই সনদ আমাদের জাতীয় ঐক্যের নতুন প্রতীক। আমরা ইতিহাসকে সম্মান জানিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করছি।”

📜 

সনদের মূল দিকগুলো এক নজরে

চূড়ান্ত সনদে সাতটি প্রধান সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত হয়েছে—

  1. প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর সীমিত রাখা
  2. এক ব্যক্তি একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান হতে পারবেন না
  3. রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কিছু ক্ষেত্রে বৃদ্ধি করা হবে
  4. নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করবে
  5. সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলের সভাপতিত্ব নিশ্চিত করা হবে
  6. স্থানীয় সরকারে বিকেন্দ্রীকরণ ও স্বায়ত্তশাসন বৃদ্ধি
  7. মানবাধিকার, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও আইনের শাসন জোরদার করা হবে

🔍 

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই জুলাই সনদ

এই সনদকে অনেকেই তুলনা করছেন ১৯৯১ সালের সংবিধান সংশোধনী ও ২০০৮ সালের সংস্কার আলোচনার সঙ্গে। পার্থক্য হলো, এবার এটি এসেছে গণআন্দোলনের পর রাজনৈতিক ঐকমত্যের ফল হিসেবে।

সনদের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন রোধ করা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা বাড়ানো এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

🗣️ 

বিরোধীদের প্রতিক্রিয়া

বাম দলগুলো বলছে, সনদে অনেক ইতিবাচক প্রস্তাব থাকলেও স্বাধীনতার চেতনার বিষয়টি পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি।

সিপিবির সাধারণ সম্পাদক বলেন—

“আমরা চাই সনদে মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকুক—গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা।”

তারা আরও দাবি করে, জনগণের অনুমোদন ছাড়া কোনো সনদ টেকসই হতে পারে না, তাই গণভোটের মাধ্যমে সনদের অনুমোদন জরুরি।

📈 

বিশ্লেষকদের মতামত

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সনদ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য একটি নতুন সূচনা।

তবে বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক একে রহমান বলেন—

“সনদের ভাষা ভালো, কিন্তু বাস্তবায়ন কাঠামো না থাকলে এটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।”

🌟 

জাতীয় ঐকমত্যের নতুন অধ্যায়

সনদ স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংস্কার ও জাতীয় ঐক্যের নতুন অধ্যায় শুরু হলো।

যেখানে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র রক্ষা পেয়ে আবারও প্রমাণিত হলো—

বাংলাদেশের আত্মপরিচয়ের মূলভিত্তি মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস ও বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাই।

📌 

সংক্ষিপ্ত সারমর্ম (ওয়েব প্রিভিউর জন্য)

জুলাই সনদ–২০২৫ স্বাক্ষরের আগে বাম দলগুলোর আপত্তিতে পরিবর্তন আনা হয়। সংবিধান থেকে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র বাদ যাচ্ছে না। সংবিধানের ১৫০(২) অনুচ্ছেদ সংশোধিত হবে, কিন্তু পঞ্চম ও ষষ্ঠ তফসিল বহাল থাকবে। সনদে রাজনৈতিক সংস্কারের ৭টি প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ২৫টি দল স্বাক্ষর করলেও ৪টি বাম দল অংশ নেয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঐকমত্যের এক নতুন মাইলফলক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *