প্রশাসনে ভাগ-বাঁটোয়ারা, উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ চায় এনসিপি | প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে এনসিপির বৈঠক
নিজস্ব প্রতিবেদকঢাকা | বৃহস্পতিবার , ২৩, অক্টোবর ২০২৫
জনপ্রশাসনে সাম্প্রতিক বদলি–পদায়ন নিয়ে ‘ভাগ-বাঁটোয়ারা’ এবং ‘দলীয় প্রভাব’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির অভিযোগ—উপদেষ্টা পরিষদের ভেতর থেকেও কিছু ব্যক্তি বড় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব খাটিয়ে প্রশাসনে নিরপেক্ষতার নীতি ভঙ্গ করছেন। এই প্রেক্ষাপটে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টাদের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানিয়েছে এনসিপি।
আজ বুধবার বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে এনসিপির একটি প্রতিনিধি দল বৈঠক করে। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সামনে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সরকারের প্রশাসনিক পদায়ন, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, জুলাই সনদ এবং সাংবিধানিক আদেশ ইস্যু নিয়ে দলের অবস্থান বিস্তারিত তুলে ধরেন।
🔹 প্রশাসনে ‘ভাগ-বাঁটোয়ারা’ অভিযোগ
বৈঠক শেষে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, “জনপ্রশাসনে যেভাবে বদলি-পদায়নগুলো হচ্ছে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, বড় রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের সুবিধামতো এসপি-ডিসি পর্যন্ত ভাগ-বাঁটোয়ারা করছে। এমনকি উপদেষ্টা পরিষদের ভেতর থেকেও কিছু ব্যক্তি এ ধরনের প্রক্রিয়ায় সহায়তা দিচ্ছেন। এটা সরকারের নিরপেক্ষতার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।”
তিনি আরও বলেন, “সরকার যদি সত্যিই নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে চায়, তাহলে এসব প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। যেসব উপদেষ্টার বিরুদ্ধে অদক্ষতা, দুর্নীতি বা দলীয় পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ আছে, তাঁদের বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টাকে পদক্ষেপ নিতে হবে।”
🔹 বিএনপির দাবির পর এনসিপির অবস্থান
এর আগের দিনই বিএনপি প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে গিয়ে সরকারকে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভূমিকা’ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। এনসিপির বৈঠককে বিএনপির সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে নাহিদ ইসলাম বিষয়টি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণাটি জুলাই সনদের আওতাধীন। সেখানে কীভাবে একটি নিরপেক্ষ সরকার গঠিত হবে, তা কমিশনে আলোচনা হয়েছে। সেখানে ভিন্নমতের নোটও আছে। সুতরাং গণভোটের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারে যাওয়া সম্ভব নয়। এখন যদি কেউ সেই দাবি তোলে, তাহলে সেটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”
🔹 উপদেষ্টা পরিষদ ‘পুরো পরিবর্তনের’ দাবির বিপক্ষে এনসিপি
বৈঠকে এনসিপি স্পষ্ট জানায় যে, বর্তমান উপদেষ্টা পরিষদ পুরোপুরি পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। তবে এর নিরপেক্ষতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমরা মনে করি, একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য উপদেষ্টা পরিষদের ভেতরে থাকা সব পক্ষেরই নিরপেক্ষ থাকা জরুরি। ছাত্র উপদেষ্টাদের ক্ষেত্রেও অনেক প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, কিন্তু তারা কোনো দলের প্রতিনিধি হিসেবে নয়—গণ–অভ্যুত্থানের প্রতিনিধি হিসেবে সরকারে আছেন। তাই শুধু ছাত্র উপদেষ্টাদের নয়, অন্য উপদেষ্টাদের বিষয়েও একই মানদণ্ডে বিচার হতে হবে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা প্রধান উপদেষ্টার কাছে কিছু নামও দিয়েছি, যাদের প্রশাসনিক ভাগ-বাঁটোয়ারা বা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষায় তাঁদের বিষয়ে পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন।”
🔹 জুলাই সনদ নিয়ে সরকারের প্রতি এনসিপির শর্ত
বৈঠকে জুলাই সনদ ও জুলাই গণহত্যা–সংক্রান্ত বিচার নিয়েও দীর্ঘ আলোচনা হয়। এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, “আমরা জুলাই সনদে সই করিনি, কারণ আমরা শুধু কাগুজে প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করি না। আমরা চাই এর বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা। এজন্য আমরা প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রস্তাব দিয়েছি, তিনি যেন একটি সাংবিধানিক আদেশ জারি করেন—যা জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতিফলন ঘটাবে।”
নাহিদ ইসলামের দাবি, এই সাংবিধানিক আদেশ রাষ্ট্রপতি চুপ্পুর নয়, বরং অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের মাধ্যমে আসতে হবে। “জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর জনগণের যে সার্বভৌম ক্ষমতা সৃষ্টি হয়েছে, তার একমাত্র বৈধতা অধ্যাপক ইউনূসের হাতে। তাই এই আদেশ তিনি জারি করবেন, প্রেসিডেন্ট নন,” বলেন তিনি।
🔹 নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ
এনসিপি বৈঠকে নির্বাচন কমিশনের আচরণ ও গঠনপ্রক্রিয়া নিয়েও তীব্র অসন্তোষ জানায়। নাহিদ ইসলাম বলেন, “নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হলেও তাদের বর্তমান আচরণ নিরপেক্ষ নয়। কিছু দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব ও অন্যদের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ স্পষ্ট। এটি যদি চলতে থাকে, তবে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা সরকারের কাছে জানিয়েছি, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন জরুরি। সুষ্ঠু নির্বাচন না হলে দায় সরকারের ওপরই বর্তাবে।”
🔹 বিসিএস নন–ক্যাডার, নির্বাচন পরিবেশ ও অন্যান্য দাবি
এ ছাড়া বৈঠকে বিসিএস নন–ক্যাডার বিধিমালা, নির্বাচনের সময় প্রশাসনের নিরপেক্ষ আচরণ, ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং নির্বাচনী পরিবেশ তৈরির মতো বিষয়েও আলোচনা হয়।
নাহিদ ইসলাম বলেন, “প্রধান উপদেষ্টা আমাদের সব কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন এবং বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছেন। আমরা বিশ্বাস করি, সরকার যদি সত্যিকারের নিরপেক্ষতা বজায় রাখে, তাহলে আসন্ন নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য হবে।”
🔹 প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে এনসিপি নেতাদের সাক্ষাৎ
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন ও যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ।
বৈঠক শেষে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এনসিপি নেতাদের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন। প্রেস উইং থেকে পাঠানো ছবিতে দেখা যায়, উভয় পক্ষ হাসিমুখে আলোচনার সমাপ্তি টানছেন।
🔹 বিশ্লেষণ: রাজনৈতিক ভারসাম্যের চেষ্টা নাকি নতুন দ্বন্দ্ব?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, প্রশাসনে ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে এনসিপির অভিযোগ সরকারের জন্য বিব্রতকর। কারণ, এর মধ্য দিয়ে মূল উপদেষ্টা পরিষদের ভেতরকার মতবিরোধও প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
বিএনপি একদিন আগেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তোলার পর এনসিপির এমন অবস্থান সরকারের ওপর চাপ বাড়াবে।
এক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, “এনসিপি মূলত নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে চায় যে তারা নিরপেক্ষতার পক্ষে। তবে একই সঙ্গে তারা প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে সরকারের বৈধতাও সমর্থন করছে। এটা এক ধরনের ভারসাম্য নীতি।”
🔹 উপসংহার
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে রয়েছেন যেখানে প্রশাসনিক সংস্কার, নির্বাচন প্রস্তুতি এবং জুলাই সনদ—তিনটি বড় ইস্যুর ভার একসঙ্গে বহন করতে হচ্ছে।
এনসিপির আজকের বৈঠক প্রমাণ করেছে, সরকারের ভেতর ও বাইরে এখন ‘নিরপেক্ষতা’ই সবচেয়ে আলোচিত শব্দ।
বৈঠক শেষে যমুনা ভবনের শান্ত পরিবেশে এনসিপি নেতারা যখন বেরিয়ে আসছিলেন, তখন সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন,
“আমরা সমালোচনা করতে নয়, সমাধান দিতে এসেছি। এই সরকার যদি নিরপেক্ষ থাকে, তাহলে জনগণই তার সবচেয়ে বড় সমর্থক হবে।”


