দ্রুত খবর পেলেও কেন নেভানো গেল না কার্গো ভিলেজের আগুন: তদন্তে অব্যবস্থাপনার চিত্র
নুরুল আমিন
ঢাকা | মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর ২০২৫
ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের তিন দিন পরও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব থামছে না। আগুনে শত শত কোটি টাকার পণ্য ভস্মীভূত হয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—দ্রুত খবর পাওয়ার পরও কেন আগুন প্রথম দিকে নিয়ন্ত্রণে আনা গেল না?
🔹 আগুনের সূত্রপাত ও প্রথম মুহূর্তের বিভ্রান্তি
গত শনিবার বেলা সোয়া দুইটার দিকে বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ কমপ্লেক্সে আগুন লাগে। এখানে আমদানি করা পণ্য ও শিল্পকারখানার কাঁচামাল সংরক্ষণ করা হয়। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) নিজস্ব ফায়ার স্টেশন দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও কার্যকরভাবে আগুন নেভাতে ব্যর্থ হয়।
ফায়ার স্টেশনের একাধিক কর্মী জানিয়েছেন, আগুনের খবর তারা এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারের (এটিসি) মাধ্যমে পান এবং সঙ্গে সঙ্গে দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। কিন্তু অগোছালোভাবে স্তূপ করে রাখা পণ্যের কারণে আগুনের উৎসে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। ফলে দূর থেকে পানি ছিটিয়েও তেমন ফল পাওয়া যায়নি।
একজন কর্মী বলেন,
“আমরা পৌঁছে দেখি, চারদিকে পণ্য গাদাগাদি করে রাখা। আগুনের উৎস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারিনি। শুধু বাইরে থেকে পানি ঢালছিলাম, কিন্তু ভেতরে আগুন আরও ছড়িয়ে যাচ্ছিল।”
🔹 অগ্নিনির্বাপণে বাধা হয়ে দাঁড়ায় বিশৃঙ্খলতা ও বাতাস
সেই সময় প্রবল বাতাস বইছিল, যা আগুনকে মুহূর্তেই ভবনের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছড়িয়ে দেয়। ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। প্রাথমিকভাবে বিমানবন্দরের নিজস্ব ফায়ার ইউনিট কাজ করলেও কিছুক্ষণ পর সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিট যুক্ত হয়। তবুও আগুন নিয়ন্ত্রণে আসতে লেগে যায় প্রায় সাত ঘণ্টা।
রাত ৯টার দিকে বিমানবন্দরের কার্যক্রম আংশিকভাবে পুনরায় শুরু হয়, কিন্তু পুরোপুরি আগুন নেভাতে সময় লাগে ২৬ ঘণ্টা।
🔹 ক্ষয়ক্ষতির হিসাব
ব্যবসায়ীরা প্রাথমিকভাবে দাবি করেছেন, আগুনে অন্তত ৩০০ কোটি টাকার পণ্য ও কাঁচামাল পুড়ে গেছে। এর মধ্যে পোশাক শিল্পের আমদানি করা ফ্যাব্রিক, মেশিন পার্টস, ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশসহ বিপুল পরিমাণ রপ্তানি পণ্যও ছিল।
তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি এই হিসাবের চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে।
🔹 বিমানবন্দর ফায়ার ইউনিটের সীমাবদ্ধতা
বেবিচক সূত্রে জানা যায়, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মোট চারটি অগ্নিনির্বাপণ গাড়ি রয়েছে, যার মধ্যে তিনটি সচল, আরেকটি মেরামতের জন্য পাঠানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী প্রতিটি বিমানবন্দরে পূর্ণ সক্ষমতার ফায়ার ইউনিট থাকা বাধ্যতামূলক।
কিন্তু আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের আটটি বিমানবন্দরে মোট ১৯টি অগ্নিনির্বাপণ গাড়ির সব কটিই মেরামতের প্রয়োজন।
২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত বেবিচকের প্রকিউরমেন্ট ও ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিট সদর দপ্তরে ১৯ বার চিঠি পাঠিয়েছিল। প্রতিটি চিঠিতেই গাড়িগুলোর ক্ষুদ্র ত্রুটি দ্রুত মেরামতের আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
🔹 “সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি”—সাবেক ফায়ার মহাপরিচালক
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আলী আহাম্মেদ খান বলেন,
“আমি ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক থাকা অবস্থাতেও শাহজালাল বিমানবন্দরে আগুনের ঘটনা ঘটেছিল। তখন বেশ কিছু সুপারিশ করেছিলাম—যেমন পণ্য রাখার সুষ্ঠু ব্যবস্থা, অগ্নিনির্বাপণ রাস্তায় বাধাহীন প্রবেশ, এবং গাড়ির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ। কিন্তু সেগুলো কোনোটি বাস্তবায়ন হয়নি। আজকের এই ক্ষতি সেই অব্যবস্থাপনার ফল।”
তিনি আরও বলেন,
“আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দরে এমন দুর্বল অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থাকা দুঃখজনক। এখানে প্রশাসনিক সমন্বয়েরও মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে।”
🔹 তদন্ত কমিটি ও প্রাথমিক দায়
বেবিচক জানিয়েছে, ঘটনাটির পূর্ণ তদন্তের জন্য দুটি পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে।
১️⃣ বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে একটি তদন্ত কমিটি করেছে।
২️⃣ ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরও একটি পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
এই কমিটির প্রধান করা হয়েছে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী, পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স)।
ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টাফ অফিসার মো. শাহজাহান শিকদার জানিয়েছেন, কমিটিকে ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
🔹 ফায়ার কর্মীদের অভিযোগ: ‘অব্যবস্থাপনার বলি আমরা’
ফায়ার ইউনিটের কর্মীরা বলছেন, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ আগুন লাগার পর পণ্য সরানোর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ফলে আগুনের উৎস পর্যন্ত পৌঁছাতে সময় লেগে যায়।
একজন কর্মীর ভাষায়,
“যদি শুরুতেই গুদামের ভেতরের পণ্য সরানোর নির্দেশ আসত, আমরা ভেতরে ঢুকে আগুনের মূল জায়গায় পানি দিতে পারতাম। তাহলে আগুন ছড়াত না, ক্ষতিও এতটা হতো না।”
তাদের অভিযোগ, বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জটিল। একটি বিভাগের সঙ্গে অন্য বিভাগের যোগাযোগে বিলম্ব হয়, ফলে জরুরি মুহূর্তে সমন্বয় সম্ভব হয় না।
🔹 আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান নিয়ে প্রশ্ন
আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন (ICAO)-এর নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফায়ার রেসকিউ ইউনিটের পূর্ণ সক্ষমতা থাকতে হয়।
কিন্তু শাহজালাল বিমানবন্দরে সেই মান অনেক আগেই নেমে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। মেরামত না হওয়া গাড়ি, অপ্রশিক্ষিত কর্মী এবং গুদাম এলাকায় অগ্নিনির্বাপণ রাস্তায় বাধা—সব মিলিয়ে বিমানবন্দর বর্তমানে “ঝুঁকিপূর্ণ” অবস্থায় রয়েছে।
🔹 ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ
কার্গো ভিলেজে আমদানি–রপ্তানি পণ্য খালাসের দায়িত্বে থাকা কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেছেন, আগুনের পরদিনও তাঁরা ক্ষয়ক্ষতির সঠিক হিসাব নিতে পারেননি।
একজন রপ্তানিকারক বলেন,
“আমাদের কোটি টাকার পণ্য ভস্মীভূত হলো। অথচ আগুন লাগার পর প্রথম এক ঘণ্টা শুধু দেখা গেছে, পানি ছিটানো হচ্ছে কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। এটা সম্পূর্ণ অব্যবস্থাপনার ফল।”
🔹 পুনরায় খালাস কার্যক্রম শুরু
আগুনের ঘটনায় তিন দিন বন্ধ থাকার পর রবিবার বিমানবন্দরের ৯ নম্বর গেট দিয়ে পণ্য খালাস কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়েছে।
বেবিচকের কার্গো ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাকিল মিরাজ বলেন,
“আমরা ঘটনাটি নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি করেছি। সব তথ্য যাচাই করে ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
🔹 নিরাপত্তা সংস্কারে এখনই পদক্ষেপ দরকার
অগ্নিকাণ্ডের পর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনাকে “সতর্ক সংকেত” হিসেবে দেখা উচিত।
কারণ, বিমানবন্দরের মতো উচ্চ নিরাপত্তা এলাকায় যদি এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে, তবে তা দেশের বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর আন্তর্জাতিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সাবেক মহাপরিচালক আলী আহাম্মেদ খান বলেন,
“এখনই সময়, বেবিচককে তাদের ফায়ার ইউনিট পুনর্গঠন করতে হবে। নিয়মিত মহড়া, যন্ত্রপাতি সংস্কার, প্রশিক্ষণ, এবং গুদাম ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা না ফিরলে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয় ঘটতে পারে।”
🧩
উপসংহার
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুন শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়—এটি দেশের বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে। দ্রুত খবর পেলেও আগুন নেভাতে ব্যর্থতা, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা, অচল অগ্নিনির্বাপণ গাড়ি, আর ফায়ার ইউনিটের সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে অব্যবস্থাপনার এক গভীর সংকট।
তদন্ত কমিটিগুলোর প্রতিবেদন এখন সবার নজরে। কিন্তু মূল প্রশ্ন রয়ে গেছে—এই আগুন কি শুধু পণ্য পুড়িয়েছে, নাকি পুড়িয়ে দিয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতি আস্থাও?


