সব পুড়ে শেষ!” ১৯ লাখ টাকা শুল্ক দিয়েও খালাস পেলেন না পণ্য—কার্গো ভিলেজে ব্যবসায়ীদের আর্তনাদ
নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা
ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুনের ঘটনায় পুড়ে গেছে কোটি কোটি টাকার পণ্য। শতাধিক ব্যবসায়ী এখন হতাশ, অসহায় আর ক্ষতির হিসাব কষছেন। অনেকে ব্যাংক ঋণ করে বা ধারদেনা নিয়ে পণ্য এনেছিলেন। আগুনে সব শেষ।
আজ রোববার সকাল থেকে কার্গো ভিলেজের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন প্যাসিফিক ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড পয়েন্ট–এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকির হোসেন। ক্লান্ত চোখে তিনি বললেন—
“আজ পণ্য খালাসের কথা ছিল। ১৯ লাখ টাকা শুল্কও দিয়েছি। কিন্তু সব পুড়ে শেষ। শুধু দাঁড়িয়ে দেখেছি, কিছুই করতে পারিনি।”
গত সপ্তাহে চারটি শিপমেন্টে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলারের চিকিৎসা সরঞ্জাম এনেছিলেন তিনি। এর একটি চালানের শুল্ক-কর পরিশোধ করা হয়েছিল। বাকিগুলো খালাসের অপেক্ষায় ছিল আজ। কিন্তু আগুন লাগার কারণে কিছুই উদ্ধার সম্ভব হয়নি।
🔹 “চোখের সামনে পণ্য পুড়েছে”
শনিবার বিকেলে কার্গো ভিলেজে আগুন লাগে। আগুন দ্রুত ভেতরের কয়েকটি গুদামে ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তার কারণে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। ফলে ব্যবসায়ীরা শুধু বাইরে দাঁড়িয়ে অসহায়ের মতো দেখেছেন তাঁদের পণ্য ধ্বংস হতে।
জাকির হোসেন বলেন,
“৯৫ হাজার, ৬৭ হাজার, ৬৪ হাজার ও ৩ হাজার ৫০০ ডলারের চারটি শিপমেন্ট ছিল। এর মধ্যে একটির শুল্ক দিয়েছিলাম। বাকিগুলো রবিবার খালাস হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আর পারলাম না।”
তিনি বলেন, “এক রাতেই সব শেষ হয়ে গেল। ভাবিনি এমন কিছু কখনো দেখতে হবে।”
🔹 শতাধিক ব্যবসায়ীর ক্ষতি
এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন আরও শতাধিক আমদানিকারক। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মেট্রনিক বাংলাদেশ লিমিটেড–এর আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক সুমন মোল্লা।
তিনি বলেন,
“আমাদের চালানে প্রায় ১৫ লাখ ডলারের চিকিৎসা সরঞ্জাম ছিল। সবই পুড়ে গেছে। শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, চিকিৎসা খাতেও এর প্রভাব পড়বে।”
অনেক প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসা সরঞ্জাম, ল্যাবরেটরি মেশিন, ওষুধ ও যন্ত্রাংশ সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। বাজারে সাময়িক ঘাটতি তৈরি হতে পারে বলেও জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
🔹 “ভেতরে ঢুকতে পারিনি, শুধু চেয়ে দেখেছি”
ডার্ট গ্লোবাল লজিস্টিকস–এর কর্মকর্তা আনোয়ার সাদাত বলেন,
“আমাদের তৈরি পোশাক, ফেব্রিক, অ্যাকসেসরিজ, মেডিকেল সরঞ্জাম—সব ছিল। হংকং, ভারত, তাইওয়ান থেকে এসেছে। আগুন লাগার পর থেকে এখানে আছি। ভেতরে ঢোকার সুযোগ নেই। চেয়ে চেয়ে দেখেছি, সব পুড়ছে।”
কার্গো ভিলেজের বিপরীতে রাস্তায় বসে থাকা ব্যবসায়ীরা কেউ ফোনে কথা বলছেন, কেউ হিসাব করছেন, কেউ আবার নিঃশব্দে তাকিয়ে আছেন ধোঁয়ার দিকে।
🔹 থমকে গেছে ছোট ব্যবসাও
কার্গো ভিলেজের পাশে ছোটখাটো দোকান, ফটোকপি সেন্টার ও খাবার হোটেলগুলোতেও নেমে এসেছে অচলাবস্থা। সেখানে প্রতিদিন ২০ হাজারের বেশি ফটোকপি হতো, এখন প্রায় সব মেশিন বন্ধ।
ফটোকপি দোকানের মালিক মো. শমসের আলী বলেন,
“৮০ বর্গফুট দোকানের ভাড়া এক লাখ টাকা। কর্মচারীদের বেতন আলাদা। কিন্তু গতকাল থেকে কাজ বন্ধ। সবাই বসে আছে।”
এই ছোট ব্যবসাগুলোর সঙ্গে যুক্ত দেড় হাজারের বেশি মানুষ এখন কর্মহীন।
🔹 আগুনের কারণ অজানা, তদন্ত কমিটি গঠন
দমকল বাহিনীর ছয়টি ইউনিট প্রায় পাঁচ ঘণ্টা চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে ভিতরের পণ্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, আগুনের কারণ অনুসন্ধানে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাত কার্যদিবসের মধ্যে তারা প্রতিবেদন দেবে।
তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন,
“প্রতিবারই তদন্ত হয়, কিন্তু ফল আসে না। এখন আমাদের ক্ষতিপূরণ দরকার, আশ্বাস নয়।”
🔹 ক্ষতির পরিমাণ কয়েকশ কোটি টাকা
সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, কার্গো ভিলেজে পুড়ে গেছে অন্তত কয়েকশ কোটি টাকার পণ্য। শুধু চিকিৎসা সরঞ্জাম খাতে ক্ষতি ৫০ কোটি টাকার বেশি হতে পারে।
এক ব্যবসায়ী বলেন,
“এই আগুনে অনেকেই পথে বসবেন। ব্যাংক ঋণ, বিদেশি ইনভয়েস, শুল্ক—সবকিছু এখন বিশাল দায়।”
🔹 আগুনে পুড়ল শুধু পণ্য নয়, স্বপ্নও
দুপুরে গেটের পাশে বসে জাকির হোসেন বলছিলেন,
“একটা চালান আনতে কত কাগজপত্র লাগে, কত দৌড়ঝাঁপ! কিন্তু এখন সব শেষ। মনে হয় জীবনের পরিশ্রমটাই আগুনে গেল।”
এই আগুনে পুড়ে গেছে শুধু পণ্য নয়—হাজার মানুষের শ্রম, ঘাম আর স্বপ্ন।
ব্যবসায়ীরা এখন সরকারের দিকে তাকিয়ে। তাঁদের দাবি, দ্রুত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হোক এবং কার্গো ভিলেজে আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা স্থাপন করা হোক।
🔹 পরিশেষে
কার্গো ভিলেজ বাংলাদেশের আমদানি বাণিজ্যের হৃদপিণ্ড। সেখানে যদি এক রাতের আগুনে কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হয়, তবে তা কেবল ব্যবসায়ীদের নয়—পুরো অর্থনীতির ক্ষতি।
এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নিরাপত্তা জোরদার, প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের দ্রুত পুনর্বাসন।
কারণ, একটি আগুন শুধু পণ্য নয়—পুড়িয়ে দেয় দেশের সম্ভাবনাও।


